তুর্কি আক্রমণ প্রতিরোধে ভারতীয় রাজ্যগুলি ব্যর্থ হয়েছিল কেন?
- সুভাষ বিশ্বাস,
ইতিহাস বিভাগ,
কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়
Causes of failure of Indian states to resist Turkish invasion.
ভূমিকা: খ্রিস্ট্রীয় অষ্টম শতক থেকে উত্তর ভারত বৈদেশিক আক্রমণকারীদের কাছে স্বর্গরাজ্য হয়ে ওঠে। তখনও পর্যন্ত আক্রমণকারীরা ভারতের অভ্যন্তরে ঢোকার চেষ্টা করেনি। এই পথ ধরে পরবর্তীকালে দশম শতকের শেষ ও একাদশ শতকের গোড়ার দিকে ভারতে প্রথম তুর্কি আক্রমণ শুরু হয়। তুর্কি আক্রমণের প্রাক্কালে উত্তর ভারতে কোনো কেন্দ্রীয় শক্তির অস্তিত্ব ছিল না। তখন বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্বল স্থানীয় শাসকদের কাছে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও আঞ্চলিকতার ভাবই বড় হয়ে ওঠে। এই সুযোগে বহিরাগত তুর্কিরা ভারত আক্রমণ করে সাফল্য পায়। তুর্কিদের আক্রমণ প্রতিরোধে ভারতীয় রাজ্যগুলি ব্যর্থতার কারণগুলি নীচে আলোচনা করা হল—
1. কেন্দ্রীয় শক্তির অভাব: তৎকালীন ভারতীয় রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় শক্তি এবং স্থানীয় শক্তিগুলির মধ্যে সর্বভারতীয় চেতনার অভাব ছিল। তারা নিজ নিজ রাজ্যের আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষায়ই বেশি আগ্রহী ছিল। বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ শক্তিজোট গড়ে তোলার কোনো চেষ্টা তাদের মধ্যে ছিল না। উপরন্তু তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিগ্রহে মত্ত ছিল। ফলে স্থানীয় ভারতীয় শক্তিগুলি তুর্কি আক্রমণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। বেশকিছু শক্তিশালী রাজপুত রাজ্য তুর্কি আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। আর তুর্কিরা জয়লাভ করে উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
2. দক্ষ নেতৃত্বের অভাব: তুর্কি সেনাবাহিনীতে মহম্মদ ঘুরি ও কুতুবউদ্দিন আইবকের মতো সুদক্ষ সামরিক নেতৃত্ব ছিল। তাদের সমগোত্রীয় নেতা ভারতীয় সামরিক বাহিনীতে ছিল না। বিভিন্ন জাতির লোকেদের নিয়ে গড়ে ওঠা বিশাল ভারতীয় বাহিনীকে একই রণকৌশলে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হয়নি। এজন্য তাদের রণকৌশলে কোনো ঐক্য ও সংহতি ছিল না। একই রাজ্যের ভারতীয় বাহিনীতে ভিন্ন ভিন্ন রণকৌশল ও রণদক্ষতা দেখা যেত। তাছাড়া ভারতীয় বাহিনীতে কোনো আদর্শবাদ না থাকায় তুর্কিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে তারা মনোবল হারিয়ে ফেলে।
3. ত্রুটিপূর্ণ রণকৌশল: ভারতীয় রাজপুত সেনা সংগঠন ও যুদ্ধ কৌশল ছিল প্রাচীন ধাঁচের। তারা নিজেদের প্রাচীন ধারাকে জগতের সেরা রণনীতি বলে মনে করত। মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার উন্নত বল্লমধারী অশ্বারোহী সেনাবাহিনীর নতুন রণকৌশল ভারতীয় সামরিক বাহিনীর উপর কোনো ছাপ ফেলতে পারেনি। তারা গুপ্তচরের মাধ্যমে তুর্কিদের মতো শত্রুর গতিবিধির খবর রাখত না। ভারতীয় রাজপুত সেনাদের যুদ্ধনীতি ছিল মূলত আত্মরক্ষামূলক। তারা ডানে, বামে ও মাঝে— এই তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে শত্রুপক্ষকে আক্রমণ ও ছত্রভঙ্গ করত।
4. শক্তিশালী তুর্কি সামরিক সংগঠন: সামরিক দিক থেকে ভারতীয় রাজপুত সেনাদের চেয়ে তুর্কিরা ছিল উন্নত। তারা রাজপুতদের রণকৌশল বুঝে আক্রমণাত্মক যুদ্ধকৌশল গ্রহণ করে। তাদের যুদ্ধনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল দুর্গ বা সামরিক ঘাঁটি আক্রমণ না করে শত্রুপক্ষকে সম্মুখ যুদ্ধে পরাস্ত করা। তুর্কি ঘোড়-সওয়াররা জনপদগুলি এড়িয়ে ছুটন্ত অবস্থায় তীর ছুঁড়ত এবং বল্লম দ্বারা শত্রুকে আঘাত করত। এই ধরনের নিত্যনতুন রণকৌশল সম্পর্কে ভারতের রাজপুত সেনাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। যুদ্ধক্ষেত্রে ভারতীয় পদাতিক বাহিনী ও তরবারির ব্যবহারে অভ্যস্ত রাজপুত সেনারা এই দুর্ধর্ষ তুর্কি সেনাদের মোকাবিলা করতে পারেনি।
5. রাজপুত রাজাদের অন্তর্দ্বন্দ্ব: রাজপুত রাজারা নিজ নিজ স্বার্থ-রক্ষার্থে পরস্পরের বিরুদ্ধে আত্মঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। বিচ্ছিন্ন ভারতীয় শক্তিগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করে তুর্কিদের প্রতিরোধ করার মতো সুযোগ্য নেতা রাজপুতদের মধ্যে তৈরি হয়নি। সমাজে ধনবন্টনের কোনো পদ্ধতি না থাকায় উচ্চবর্গের লোকেরা সম্পদশালী হলেও নিম্নবর্গের লোকেরা ছিল অবহেলিত ও নির্যাতিত। তারা রাজপুত নেতাদের কাছ থেকে সামাজিক ন্যায়বিচার পায়নি। এ প্রসঙ্গে আলবিরুনী মন্তব্য করেছেন যে, “হিন্দুদের কোনো ব্যবস্থা যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ত, তাকে সংস্কার করে তার পূর্ণ জীবনদানের কোনো আগ্রহ দেখা যেত না।”
6. হিন্দু সমাজের দুরবস্থা: আর. সি. দত্ত, ড. হাবিব প্রমুখ ঐতিহাসিকরা ভারতীয়দের পরাজয়ের জন্য মূলত হিন্দু সমাজের রক্ষণশীল নীতিকে দায়ী করেছেন। এর জন্য মূলত জাতিভেদ প্রথাকে দায়ী করা যেতে পারে। হিন্দুদের প্রতিক্রিয়াশীল সমাজব্যবস্থায় উচ্চবর্ণের হিন্দুরা সকল সুযোগ-সুবিধা পেলেও নিম্নবর্ণের পতিত ও অস্পৃশ্য মানুষ ছিল অবহেলিত। একমাত্র ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দেরই ধর্মশাস্ত্র পাঠ ও রাজনৈতিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণের অধিকার ছিল। তাই তুর্কি আক্রমণকারীদের প্রতিরোধের ক্ষেত্রে এই শ্রেণি নিষ্ক্রিয় থাকে।
7. কুসংস্কার ও অবক্ষয়: বাল্য বিবাহ, বহু বিবাহ, বিধবা বিবাহ, সতীদাহ প্রভৃতির মতো কুপ্রথা তৎকালীন হিন্দু সমাজকে জর্জরিত করে। সমাজে কোনো নৈতিকতা ও আদর্শবাদ না থাকায় হিন্দুসমাজ অসংখ্য সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কুসংস্কার ও কুপ্রথার পালন তৎকালীন সমাজের প্রাণশক্তিকে দুর্বল করে দেয়। নানা সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যভিচার ও অবিচার হিন্দু সমাজকে পুঙ্গ করে দেয়। বিভিন্ন কুসংস্কার ও কুপ্রথায় বিভক্ত হিন্দু সমাজে জাতীয় চেতনার অভাব দেখা দেয়। প্রজাদের মধ্যে যুগোপযোগী রাষ্ট্র গঠনের নীতিগত চেতনার অভাব ছিল। ফলে তুর্কিদের মতো শক্তিশালী বৈদেশিক আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তারা ব্যর্থ হয়।
8. সামন্তপ্রথা: তুর্কি বিজয়ের প্রাক্কালে রাজপুত রাজ্যগুলিতে সামন্তপ্রথা প্রচলিত ছিল। ফলে তৎকালীন স্থানীয় শক্তিগুলির মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব ও স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু হয়। এই প্রথায় অভিজাত ও বণিকরা বিলাস-ব্যসনে দিন কাটালেও সাধারণ কৃষক-কারিগর শ্রেণী ছিল অবহেলিত। তুর্কি আক্রমণের সময় অবহেলিত ও বঞ্চিত এই শ্রেণী নীরব ভূমিকা পালন করে।
9. উপসংহার: ///
No comments:
Post a Comment