Top Menu

Saturday, 28 March 2026

হরমুজ প্রণালী: বিশ্ব অর্থনীতির সেই ‘সরু পথ’ যা নিয়ন্ত্রণ করে গোটা পৃথিবীক

🕒 পড়ার সময়: ৫ মিনিট
f 𝕏 w

হরমুজ প্রণালী: বিশ্ব অর্থনীতির সেই ‘সরু পথ’ যা নিয়ন্ত্রণ করে গোটা পৃথিবীকে

লিখেছেন: ড. সুভাষ বিশ্বাস

চিত্র ১: পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্তকারী হরমুজ প্রণালী।

        বিশ্ব মানচিত্রের দিকে তাকালে মধ্যপ্রাচ্যের একটি সরু জলপথ আপনার নজর কাড়বে। দৈর্ঘ্যে মাত্র ৩০ মাইল বা ৫০ কিলোমিটারের মতো এই পথটিই হলো হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz)। আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির বিচারে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থান। কেন এই প্রণালীটি নিয়ে বিশ্ব পরাশক্তিদের এত মাথাব্যথা? চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

১. হরমুজ প্রণালী কী এবং এর গুরুত্ব কেন এত বেশি?

        হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরকে যুক্ত করেছে। বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ সমুদ্রপথে সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে বড় একটি অংশ এই সরু পথ দিয়ে যাতায়াত করে। ভৌগোলিক পরিভাষায় একে বলা হয় 'চোক পয়েন্ট' (Choke Point)। অর্থাৎ এমন একটি সরু পথ যা বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসবে।

"২০২১ সালে সুয়েজ খালে একটি জাহাজ আটকে পড়ায় প্রতিদিন প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালী যদি কোনো কারণে বন্ধ হয়, তবে সেই ক্ষতির পরিমাণ কল্পনাকেও হার মানাবে।"

২. জ্বালানি তেলের ‘লাইফলাইন’

        বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় এক-তৃতিয়াংশ (৩৩%) এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৪০ শতাংশ এই পথ দিয়ে সরবরাহ করা হয়।

  • তেল: পারস্য উপসাগরীয় ৮টি দেশ (ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান) তাদের তেল রপ্তানির জন্য এই পথের ওপর নির্ভরশীল।
  • গ্যাস: কাতার বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এলএনজি রপ্তানিকারক এবং ইরান প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডারে সমৃদ্ধ। এই দুই দেশের গ্যাস সরবরাহের একমাত্র সমুদ্রপথ হলো হরমুজ।

💡 গুরুত্বপূর্ণ তথ্য (Quick Facts)

  • দৈর্ঘ্য: প্রায় ৩০ মাইল (৫০ কিমি)।
  • প্রতিদিন তেল পরিবহন: প্রায় ২১ মিলিয়ন ব্যারেল।
  • বিশ্ব অর্থনীতির প্রভাব: এটি বন্ধ হলে তেলের দাম ৩০০% পর্যন্ত বাড়তে পারে।

৩. কারা সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল?

        হরমুজ প্রণালী দিয়ে রপ্তানি হওয়া জ্বালানির প্রায় ৭৬ শতাংশ যায় পূর্ব এশিয়ায়। চীন-এর মোট চাহিদার ৪৫% জ্বালানি এই পথে আসে। জাপান-এর ক্ষেত্রে এটি প্রায় ৪৮% এবং দক্ষিণ কোরিয়া প্রায় ৩০% জ্বালানির জন্য এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল।

Strait of Hormuz দিয়ে চলমান তেলবাহী ট্যাঙ্কার জাহাজ, বিশ্ব তেল বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট
চিত্র ২: হরমুজ প্রণালী দিয়ে অতিক্রমকারী একটি বিশাল তেলবাহী জাহাজ।

৪. ভূ-রাজনীতি ও সামরিক উত্তেজনা

        হরমুজ প্রণালী নিয়ে সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে। বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর ‘পঞ্চম নৌবহর’ এবং কাতারে বড় বিমান ঘাঁটি রয়েছে। অন্যদিকে এই প্রণালীর উত্তর অংশ ইরানের নিয়ন্ত্রণে। ইরান বারবার হুমকি দিয়েছে যে, তাদের স্বার্থ বিঘ্নিত হলে তারা এই প্রণালী বন্ধ করে দেবে।

৫. নৌ চলাচলের প্রতিকূলতা ও জাতিসংঘের ভূমিকা

        হরমুজ প্রণালী সব জায়গায় জাহাজ চলাচলের উপযোগী নয়। এর কিছু অংশ অত্যন্ত অগভীর। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ এখানে দুই লেনের একটি সমুদ্রপথ তৈরি করেছে। প্রতিটি লেন প্রায় ২ মাইল চওড়া এবং দুটি লেনের মাঝে একটি বাফার জোন রাখা হয়েছে যাতে জাহাজগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ না হয়।

📚 ইতিহাস বিষয়ক সেরা বই:
ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি নিয়ে আরও বিস্তারিত জানতে আজই সংগ্রহ করুন।
Buy on Amazon

৬. বিকল্প কি কোনো পথ নেই? (Added Value)

        অনেকেই ভাবেন হরমুজ বন্ধ হলে কি বিশ্ব পুরোপুরি অচল হয়ে যাবে? কিছু বিকল্প পথ তৈরির চেষ্টা চলছে। যেমন— সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত কিছু পাইপলাইন তৈরি করেছে যা হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে ওমান উপসাগর বা লোহিত সাগরে তেল পৌঁছে দিতে পারে। তবে সেগুলোর ক্ষমতা হরমুজ প্রণালীর তুলনায় অত্যন্ত কম।

উপসংহার

        হরমুজ প্রণালী কেবল একটি জলপথ নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির নাড়ি। এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ যার হাতে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের নিয়ন্ত্রণও অনেকাংশে তাদের হাতে। তাই সামান্য কোনো উত্তেজনা বা এই পথে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে পুরো পৃথিবীতে তেলের দাম হুহু করে বেড়ে যায় এবং শুরু হয় মুদ্রাস্ফীতি।

Scan to Subscribe
QR Code

About the Author

Dr. Subhas Biswas

Associate Professor, Department of History

University of Kalyani, Kalyani, Nadia, West Bengal.

⬆️ উপরে যান

No comments:

Post a Comment