বাংলায় নীলকরদের অত্যাচার ও নীল বিদ্রোহ
— ড. সুভাষ বিশ্বাস,
অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়
📌 সূচিপত্র (Table of Contents)
প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত নীল রঙের অন্যতম উৎস হল নীল গাছ বা ‘ইন্ডিগোফেরা টিনক্টোরিয়া’ নামক উদ্ভিদ প্রজাতি। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ জামাকাপড় রঙ করতে গাছ থেকে উৎপাদিত এই নীল ব্যবহার করে আসছে। শিল্পবিপ্লবের যুগে ইউরোপের কলকারখানায় উৎপাদিত সুতিবস্ত্র রঙ করার জন্য নীলের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। তাই ব্রিটিশ নীলকররা বাংলায় উৎপাদিত উৎকৃষ্টমানের নীল ইংল্যান্ডের বাজারে চড়া দামে বিক্রি করে অধিক মুনাফা লাভের উদ্যোগ নেয়। তারা বাংলার নীলচাষীদের বলপূর্বক নীলচাষ করতে বাধ্য করে। ফলে শোষিত ও অত্যাচারিত নীলচাষীরা ব্রিটিশ নীলকরদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই বিদ্রোহই ইতিহাসে ‘নীল বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত।
“বেদনার প্রতীক হিসেবে কবিতায়ও নীলের ব্যবহার আছে, অবশ্য তা বস্তুগত নীল নয়, আলঙ্কারিক।” — সুভাষ মুখোপাধ্যায়
প্রাচীনকাল থেকেই ভারতে নীলের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। ভারতীয় ভেষজ বিজ্ঞানের নানা গ্রন্থে, প্রাচীন প্রতিমূর্তির বর্ণে এবং বিভিন্ন চিত্রকর্মে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এজন্য ধারণা করা হয় যে, এদেশেই নীলচাষের উৎপত্তি। লুই বোনার্ড নামের একজন ফরাসি বণিকের মাধ্যমে এদেশে আধুনিক পদ্ধতিতে নীলচাষের প্রচলন ঘটে। তিনি 1777 খ্রিস্টাব্দে আমেরিকা থেকে উন্নতজাতের নীলবীজ ও আধুনিক চাষের পদ্ধতি এদেশে নিয়ে আসেন। একই বছরে হুগলীর চন্দননগরের নিকটবর্তী গোয়ালপাড়া ও তালডাঙ্গা গ্রামে তিনি নীলের চাষ শুরু করেন এবং নীলকুঠি স্থাপন করেন। এজন্য তাকে বাংলার প্রথম নীলকর বলা যায়।
নীলকরদের আধিপত্য ও বিভিন্ন আইন
1833 খ্রিস্টাব্দের সনদ আইনের ফলে ইংরেজদের একচেটিয়া অধিকার লোপ পায় এবং ব্রিটেন থেকে দলে দলে ইংরেজ নীলকররা বাংলায় এসে নিজেদের ইচ্ছামত এখানকার চাষীদের দিয়ে নীলের চাষ শুরু করে। বাংলায় উৎপাদিত নীলের অর্ধেক উৎপন্ন হত অবিভক্ত বাংলার যশোর ও নদীয়া জেলায়। 1859 খ্রিস্টাব্দ নাগাদ সমগ্র বাংলায় এই ধরণের অত্যাচারী নীলকরের সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচশ জন।
ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ 1819 খ্রিস্টাব্দে ‘অষ্টম আইন’ (Eight regulation of 1819) পাস করে। এই আইনে জমিদার নিজের জমির ভেতর ‘পত্তনি তালুক’ দেওয়ার সুযোগ পায়। জমিদাররা অধিক মুনাফার লোভে নীলকরদের কাছে বড় বড় পত্তনি দিতে শুরু করে। প্রসন্নকুমার ঠাকুর বলেছেন, “আলস্য, অনভিজ্ঞতা ও ঋণের জন্য দেশীয় জমিদারগণ জমি পত্তনি দিতে উদগ্রীব হন।”
💡 গুরুত্বপূর্ণ তথ্য (Quick Facts)
- ১৭৭৭: লুই বোনার্ড কর্তৃক নীলচাষের সূচনা।
- ১৮১৯: অষ্টম আইন (পত্তনি তালুক ব্যবস্থা)।
- ১৮৩৩: চতুর্থ আইন (জমিদারি ক্রয়ের সুযোগ)।
- ১৮৫৯: নীল বিদ্রোহের সূত্রপাত।
নিজ আবাদ পদ্ধতি ও রায়তি পদ্ধতি
সমগ্র বাংলায় নীলচাষকে ছড়িয়ে দিতে নীলকররা প্রথমে ‘নিজ আবাদ পদ্ধতি’ এবং পরে ‘রায়তি পদ্ধতি’ অবলম্বন করে। নিজ আবাদ পদ্ধতিতে জমিদারদেরর কাছ থেকে নীলকরদের জমি কিনতে হত। তবে এটি নীলকরদের কাছে খুব একটা লাভজনক ছিল না। অন্যদিকে, রায়তি পদ্ধতিতে নীলকরদের সঙ্গে নীলচাষী বা রায়তদের চুক্তি হত। নীলকররা নীলচাষের জন্য রায়তকে সামান্য পরিমাণে অগ্রিম অর্থ বা ‘দাদন’ প্রদান করত। এই দাদনের জালে আটকা পড়লে চাষীরা নীলচাষের ঘেরাটোপ থেকে বেরোতে পারত না।
বিদ্রোহের সূচনা ও বীর নেতৃবৃন্দ
1859 খ্রিস্টাব্দে নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরের নিকটবর্তী চৌগাছা গ্রামে বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাসের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম নীল বিদ্রোহের সূচনা হয়। এরপর এই বিদ্রোহ দ্রুত বাংলার অন্যান্য জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। নীলচাষীরা বহু নীলকুঠি ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। চাঁদপুরে এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হাজি মোল্লা। তিনি ঘোষণা করেন ‘নীলচাষ থেকে ভিক্ষা উত্তম।’
বাংলার নদীয়া জেলার নীল বিদ্রোহের অপর এক বীর নেতা ছিলেন বিশ্বনাথ সর্দার। ইংরেজরা তাঁকে ‘বিশে ডাকাত’ নামে আখ্যায়িত করলেও অনেকের কাছে তিনি নীল বিদ্রোহের প্রথম শহীদ হিসেবে গণ্য হন। এছাড়াও পাবনার কাদের মোল্লা, মালদার রফিক মণ্ডল এবং বর্ধমানের শ্যামল মণ্ডল এই বিদ্রোহের জনপ্রিয় নেতা ছিলেন।
বুদ্ধিজীবী ও 'নীল দর্পণ' নাটকের ভূমিকা
বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে নীলচাষীদের ওপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ জানান। হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ এবং অক্ষয় কুমার দত্ত সম্পাদিত ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকা নিয়মিতভাবে সরব ছিল। দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীল দর্পণ’ নাটকটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। নাটকটি প্রকাশ করার অপরাধে রেভারেন্ড জেমস লঙ-কে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং ১০০০ টাকা জরিমানা করা হয়, যা কালীপ্রসন্ন সিংহ পরিশোধ করেন।
নীলকরদের অত্যাচারের ধরণ ও প্রতারণা
নীলকররা নীলচাষীদের ওপর যে নির্মম অত্যাচার চালাত তা বর্ণনা করা কঠিন। ফরিদপুরের ম্যাজিস্ট্রেট ডেলাতুর নীল কমিশনকে বলেছিলেন:
“এমন একটা নীলের বাক্স ইংল্যান্ডে পৌঁছায় না যেটা মানুষের রক্তে রঞ্জিত নয়।”
নীলকররা চাষীদের ভুল বুঝিয়ে জমি লিখিয়ে নিত, ওজনে কম দিত এবং রাজি না হলে কুঠিতে আটকে রেখে চাবুক মারত। এমনকি চাষীদের মাথা মুড়িয়ে তাতে কাদা মেখে নীলের বীজ বুনে দেওয়ার মতো অমানবিক ঘটনাও ঘটেছে।
বাজিল শিবনাথের ডঙ্কা, ধন্য বাঙ্গালা বাহাদুর।"
নীল কমিশন ও বিদ্রোহের অবসান
নীলচাষীদের একজোট হওয়ার শক্তি ও বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলনের চাপে ইংরেজ সরকার 1860 খ্রিস্টাব্দের 31 ডিসেম্বর ‘নীল কমিশন’ গঠন করে। কমিশনের তদন্তে নীলকরদের দোষ প্রমাণিত হয় এবং রায় দেওয়া হয় যে নীলচাষ সম্পূর্ণভাবে চাষীদের ইচ্ছাধীন হবে। অবশেষে 1860-62 খ্রিস্টাব্দ নাগাদ এই বিদ্রোহের অবসান হয়। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত নীলকরদের নিন্দা জানিয়ে লিখেছিলেন:
এইদেশে উঠেছে এইভাষ, যত প্রজার সর্বনাশ।"
No comments:
Post a Comment